টর নেটওয়ার্কঃ ইন্টারনেটে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা যেখানে

ইন্টারনেট নিজের পরিচয় গোপন রাখতে আমরা ভিপিএন ব্যবহার করে থাকি। তবে ভিপিএন থেকে আরো বেশি নিরাপদ মাধ্যম হলো টর নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা থাকে এই নেটওয়ার্কে।

আমরা অনেকেই হয়তো টর নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানি। আর যারা এটি নিয়ে জানা না থাকলে এই লেখার মাধ্যেম জেনে নিতে পারবেন। তো কথা না বাড়িয়ে জেনে নেওয়া যাক, টর নেটওয়ার্কের আদ্যোপান্ত।

টর নেটওয়ার্ক কি?

অনিয়ন রাউটার (The Onion Router) এর সংক্ষেপ রুপ হচ্ছে টর (TOR)। অনিয়ন অর্থ হচ্ছে পেঁয়াজ। এই নেটওয়ার্কের গঠন মূলত পেঁয়াজের মতোই তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে অনিয়ন রাউটার। অনিয়ন রাউটিং নীতির উপর ভিত্তি করে এই নেটওয়ার্ক তৈরী করা হয়েছে।

টর নেটওয়ার্কে নিরাপত্তা থাকে অনেকগুলো স্তরে। এই সকল স্তরে ব্যবহারকারীদের তথ্য এনক্রিপ্ট করে রাখা হয়। এর ফলে ব্যবহারকারীদের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সম্পূর্ণ গোপণীয়ভাবে ব্রাউজিং করা যায়।

টর নেটওয়ার্কের ইতিহাস

এই নেটওয়ার্ক তৈরীর কাজ ১৯৯০ এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গবেষণাগারে শুরু হয়। এর প্রাথমিক সংস্করণ ২০ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে প্রকাশ করা হয়। এর প্রোগ্রাম লেখা হয়েছে সি, পাইথন ও রাস্ট।

টর নেটওয়ার্ক কিভাবে কাজ করে?

আমরা প্রতিদিন ইন্টারনেট বিভিন্ন কিছু ব্রাউজিং করে থাকি। আমরা এই ব্রাউজিং সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই করে থাকি। সাধারণ ব্রাউজারগুলোতে ব্রাউজিং এর সময় সরাসরি রিকোয়েস্ট আপনার ডিভাইস থেকে আইএসপির কাছে পাঠানো হয় এবং আইএসপি ওয়েব সার্ভারে পেজের জন্য রিকোয়েস্ট করে। এরপরই আপনার সামনে নির্দিষ্ট সাইটিটি চলে আসে। এই ধাপগুলো পার করেই আপনি আমাদের এই লেখাটি পড়তেছেন। এইভাবে ব্রাউজিং এর ফলে আপনার আইএসপিগুলো আপনার আইপি ঠিকানা, কোথায় থেকে ব্রাউজিং করছেন এবং কোন ডিভাইস থেকে ব্রাউজিং করতেছেন সব কিছু জানতে পারে।

এখন আপনি যদি টর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্রাউজিং করতেন তাহলে আপনার সকল তথ্য সাথে সাথেই এনক্রিপট করে দেওয়া হয়। এই এনক্রিপটের কাজ করা হয় বিভিন্ন টর সার্ভারের মাধ্যমে। এই সকল টর সার্ভারগুলো ঘুরে এসেই নির্দিষ্ট ওয়েব সার্ভারে রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। ফলে কেউ জানতে পারে না ব্যবহারকারী কোথা থেকে ব্রাউজিং করছে। ব্যবহারকারীকে ট্র্যাক করা যায় না। ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং তথ্য থাকে নিরাপদ।

টর নেটওয়ার্কের এই ধাপগুলোকে বলা হয় রিলে। প্রতিটি রিলের জন্য আলাদা আলাদা এনক্রিপশন থাকে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৬ হাজার রিলে কম্পিউটার রয়েছে। বিভিন্ন মানুষ বিনামূল্য এই রিলে সেবা দেওয়ার কাজ করে চলছে।

এই রিলে হয়ে থাকে তিনটি ধাপে। ধাপগুলো হলোঃ

টর নেটওয়ার্ক

এন্ট্রি গার্ড রিলে

এটি হলো প্রথম স্তর। এই স্তরে আপনার সকল তথ্য মুছে দেওয়া হয় এবং তা মিডল রিলে তে পাঠানো হয়।

মিডেল রিলে

এটি হলো এনক্রিপশনের মধ্যম ধাপ। এই ধাপে আপনার কোনো তথ্য থাকবে না। শুধু জানা যাবে এই তথ্যটি এসেছে এন্ট্রি গার্ড রিলে থেকে।

এক্সিট রিলে

এই ধাপে এসে আপনার পাঠানো ডাটা প্যাকেটটি খোলা হবে। আপনার কাঙ্ক্ষিত ওয়েব সার্ভারে প্রেরণ করা হয়। এইখান থেকে কেউ চেষ্টা করলে আপনার পাঠানো তথ্য দেখতে পারবে কিন্তু আপনার কোনো তথ্য জানতে পারবে না।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন টর নেটওয়ার্ক কিভাবে কাজ করে।

টর নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অসুবিধা

এই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুবিধাগুলোতে উপরেই জেনে গেলেন, এইবার জেনে নিন এর অসুবিধা। টর নেটওয়ার্ক অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে আপনার কাঙ্ক্ষিত সাইটটি আপনার সামনে উপস্থাপন করে থাকে। এই ধাপগুলোর ফলে ব্রাউজিং গতি থাকবে অনেক কম। এমনকি ভিপিএনের থেকেও কম থাকে। আমার কাছে এটি একমাত্র অসুবিধা।

টর নাকি ভিপিএন?

টর নেটওয়ার্কের অসুবিধা জেনে হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ভিপিএন ব্যবহার করলে অসুবিধা কোথায়? ভিপিএনও তো আমাদের তথ্য গোপন করে রাখে।

হ্যা, আপনি ঠিক বলেছেন ভিপিএন আমাদের তথ্য গোপন করতে সাহায্য করে। তবে ভিপিএন ব্যবহারকারীদের তথ্য ভিপিএন প্রোভাইডাররা জানতে পারে। প্রোভাইডারের কাছে আপনার আইপি ঠিকানা ও সকল তথ্য থাকে। ইচ্ছে করলেই আপনার তথ্য তারা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রিও করতে পারবে। এই সুযোগটি নেই টর নেটওয়ার্কে। এইখানে আপনার সকল ডাটা থাকবে একদম নিরাপদ।

ভিপিএন থেকে টর নেটওয়ার্কের গতি বেশি হওয়ার কারণ হলো ভিপিএনে আপনার তথ্য শুধুমাত্র একটি সুড়ঙ্গের মাধ্যমে যায়। এর ফলে এটির গতি থাকে বেশি। আর টর নেটওয়ার্ক বিভিন্ন রিলে ঘুরে ওয়েব সার্ভারে তথ্য প্রেরণ করে। এর ফলে গতিও কমে যায়।

এখন আপনি যদি আপনার তথ্যের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তাহলে আপনার জন্য টর হবে সর্বোত্তম। আর আপনি গতিময় ব্রাউজিং চাইলে ভিপিএন ব্যবহার করতে পারেন। ভিপিএন একটি নিরাপদ মাধ্যম।

টর নেটওয়ার্ক কিভাবে ব্যবহার করবেন?

আপনি সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে চাইলেই টর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্রাউজিং করতে পারবেন না। এর জন্য লাগবে আলাদা একটি ব্রাউজার, এর নাম টর ব্রাউজার। এই ব্রাউজারটি মজিলা ফায়ারফক্স ব্রাউজারের উপর মডিফাই করে তৈরী করা হয়েছে, তাই দেখতে ফায়ারফক্সের মতোই। এই ব্রাউজারটি টর প্রজেক্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আপনি ডাউনলোড করতে পারবেন। ব্রাউজারটি ইন্সটল করে খুব সহজেই আপনি টর নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত হতে পারবেন। টর নেটওয়ার্ক জিনিসটা জটিল হলেও এর সাথে যুক্ত হওয়াটা অনেক বেশি সহজ।

টর ব্রাউজার ব্যবহার করে ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে পারবেন যদি আপনার কাছে সেই ওয়েবের ঠিকানা থেকে থাকে। এছাড়াও অ্যান্ড্রয়েডের জন্য রয়েছে Tor Browser for Android, Orbot এবং Orfox নামে প্লেস্টোরে অ্যাপ রয়েছে, এই অ্যাপগুলোর যেকোনো একটা ব্যবহার করেই আপনি খুব সহজেই টর নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে পারবেন।

সবশেষে একটাই কথা বলতে চাই, ভালো কাজের জন্য ব্যবহার করুণ, কোনো ক্রাইম করার জন্য নয়। ক্রাইম করলে আপনি ধরা খাবেননি।

লেখাটি কেমন লাগলো তা আমাদেরকে জানাবেন, আপনাদের অনুপ্রেরণা আমাদের শক্তি।

ইরফান

প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জানতে এবং জানাতে ভালোবাসি, জানানোর লক্ষ্য নিয়ে ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুললাম টেকি নাউ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।